কবিতার আলোচনা: টিপু সুলতানের কবিতায় নস্টালজিয়া- মুস্তাক মুহাম্মদ

কবিতার আলোচনা


নস্টালজিয়ায় (স্মৃতিকাতরতা) ভেসে যেতে কার না ভালো লাগে। স্মৃতি বড় বেদনার হলেও মানুষ অতীত স্বরণ করে এক ধরণের সুখ লাভ করে। যে কারণে বার বার অতীতে মানুষ ফিরে যায়। অতীত ফিরে পেতে চাই। এক সময় মানুষ পূর্ণতার দিকে যেতে চাই। কিন্তু কাঙ্খিত লক্ষে পৌঁছানোর পর আবার পেছনে ফিরে যেতে চাই-  এটা স্বভাবিক নিয়ম।

কবি টিপু সুলতানের কবিতায় নস্টালজিয়া, মৃত্যুচিন্তা, রোমান্টিকতা, বর্তমান সমাজ- যাপিত জীবন  ফুটে উঠেছে। বর্তমানের অনেক সমস্যার কথা তার কবিতায় বার বার এলোও নস্টালজিয়া যেনো কবিকে বেশি আকর্ষণ করেছে। নস্টালজিয়ায় ভর করে তিনি আগের সেই দিনগুলো ফিরে পেতে চান। শাহ আব্দুল করিম যেমন বলেছেন, ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাতাম / গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান/ মিলিয়া বাউলা গান আর মুর্শিদি গাইতাম।’ স্মৃতিকাতরতা কবি টিপু সুলতানের কবিতার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।

“এই গাঁয়ের আকা- বাঁকা পথ ধরে দস্যি ছেলের দুরন্ত ছুটে চলা/অথবা গাঁয়ের সবচেয়ে দুরন্ত মেয়েটির /হঠাৎ শাড়ির আঁচলে মুখ ঢেকে দূরে কোথাও চলে যাওয়া / এ পথের পানে চেয়েই তহুরনের বুকফাটা আর্তনাদ (আমার গাঁয়ের পথ ধরে)

টিপু সুলতানের কবিতায় তার শৈশবের গ্রামের পরিবেশ চার পাশ, জীবনধারা, সংস্কৃতি  এসব বার বার এসেছে। তিনি পরম মমতা দিয়ে তা কবিতার ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছেন। বাংলাদেশের গ্রামে এখনো সামান্য বিষয় নিযে কাইজা হয় অর্থ্যাৎ গ্রামবাসীরা মিলে রক্ত ক্ষয়ী সংঘর্ষ বাঁধায়।  এতে কত মানুষের রক্ত ঝরে, আর্থিক ক্ষতি হয় যা অপূরণীয়। উপমার বাহারে কবি টিপু সুলতান তা ফুটিয়ে তুলেছেন ।“সীমানা আইল নির্ধারণ করেছে কোনো এক জোতদার। সহসা বেঁধেছে কাইজে/ ধুলোর ওপরে পড়েছে কিশোরীর লাল টিপের মতো জমাট বাঁধা  ফোঁটা ফোঁটা শোণিত । ঐ মাঠেই তো একদিন মনছুর ঘোড়া দাবড়িয়েছে সময়কে পিছনে ফেলে ( ওপারের মাঠ)

তিনি বয়ড়াতলার খালে একদিন শিরোনামের কবিতায় স্মৃতিকাতরতা প্রকাশ  করেছেন এভাবে ‘এই খালের রাতে কত না মাঝি, কত না পথিকের / পথের ক্লান্তি আর মনের অথবা অভাবের শিকল / ছিঁড়তে না পারার যন্ত্রণা ধুয়ে মুছে গেছে একদিন”

ব্যবসায়ী মানুষের কাছে শিল্প প্রদর্শনী হয়ে যায় নিছক ব্যবসা মাত্র। তাদের মানবিকতা থাকে না ।মানুষের এ  অমানবিক কষ্ট আমরা দেখতে পাই  এভাবে ‘কিন্তু ওদের কাছে ক্লান্তির ক্ষমা নেই / স্বপ্নাদি তা বুজে নেয় সবার অলক্ষে। (স্বপ্নাদি)

বর্তমানে আমাদের শিশুদের শৈশব আমরা কেড়ে নিচ্ছি। আমরা চাপিয়ে দিচ্ছি – বই। ক্লাসে ফাস্ট  হওয়ার অসুস্থ প্রতিয়োগিতা । অমুক এ পারে তমুক তা পারে, তোমাকে গলদঃকরণ করতে হবে নোট /গাইড বই । যে বযসে শিশুরা প্রশ্ন বানে জর্জারিত করবে। সে সময় সে প্রশ্নের মুখস্ত উত্তর দিতে দিতে নিজেকে হারায়ে ফেলে। সৃজনশীরতা হারায়ে যায়। আমরা যদি মানবিক হই- এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা না করি তালে সমৃদ্ধিময় বাংলাদেশ পেতে পারি।

 

বাংলাদেশের চাযের দোকানে বসলে নানা কিসিমের  মানুষের ভাষ্য শোনা যায়। বিভিন্ন মতে পথের মানুষ সেখানে বসে।  বিভিন্ন গল্প করে, কি থাকে না সেখানে, রাজনীতি সমাজ নীতি, ধর্ম, দেশের সব খবর চায়ের দোকানে পাওয়া যায়। জনগণের প্রত্যাশা কি তাও বোঝা য়ায় যদি আমরা একটি চায়ের দোকানে বসি। চায়ের দোকান হলো খবর ভান্ডার। এই ভান্ডারে কি নেই । সব খবর  তথা টোটাল সমাজ চিত্র চায়ের দোকানে আপনি পাবেন। কবি লিখেছেন ‘শালারা  সব চোর, চৌর্যবৃত্তিতে ভরে গেছে পুরো দেশটা / আরে কী হলো কানাই মাস্টার, হঠাৎ এত ঝেড়ে কাশছো যে। /না, চাচা দ্যাখেন, পেপারটা খুলে দ্যাখেন (দুর্নীতিতে বাংলাদেশর আবার প্রথম হওয়ার খবর ) / শুধুমাত্র চৌর্যবৃত্তিতর কারণে দেশটার কোনো উন্নতি হলো না। (একটি চায়ের দোকানে যে যার  ভূমিকায়)

গ্রামে পরিবারে  বড় ছেলেদের তার অনুজরা মিঞা ভাই বলে ডাকে। প্রকৃত পক্ষে মিঞা ভায়েরা পিতার ছায়া হয়ে কাজ করে । অনেক সময় পিতা মারা গেলে মিঞা ভায়েরা  পিতার আসনে বসে। তারা ত্যাগ স্বীকার করে ছোট ছোট ভাই – বোনদের  মানুষ করে। তা করতে গিয়ে তারা নিজেরা নিজেদের বঞ্চিত করে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা অনুজদেও দেয়। এই মিঞা ভাইদের নিযে সম্ভবত  বাংলাদের  প্রথম কবিতা লিখলেন নসটালজিক  কবিতা কবি টিপু সুলতান। ‘আমি শব্দটি ক্রমাগত লালন  করি / আমার চলার পথ প্রশস্ত হয়/ দিকভ্রান্ত হবার ভয় থাকে না/বাংলার কত শত পরিবার একজন /মিঞা ভাইয়ের কাছে ঋণই/জানি  না তার কোন পরিসংখ্যান কেউ সংরক্ষণ করে কিনা। (শ্রদ্ধেয় আরাধ্য)

টিপু সুলতান ২০১৫ সালে প্রথম শিশু উপযোগী অনুবাদ বই বের করে। দুটি অনুবাদ এবং দুটি কবিতার বই বের হয়েছে ইতোমধ্যে। যা পাঠক হৃদয়ে ভাবনার আন্দোলন সৃষ্টি  করবে বলে আমার বিশ্বাস।

কবি টিপু সুলতানের এ পর্যন্ত দুটি কবিতার বই বের হয়েছে, তার দুটি শিশুদেরও বইও আছে। এখনো লিখে চলেছেন। কবিতা লেখেন সমাজ, মৃত্যু চিন্তা  রাজনৈতিক সচেতনতা, অর্থনীতি যাপিত জীবন নিয়ে। আমরা হারিয়ে ফেলছি আমাদের গৌরবময় অতীত। আমরা আসল ছেড়ে মেকির পেছনে ছুটছি; যার পরিণতি শুভ নয়। এক অশুভ পরিণতির দিকে আমাদের আগামি প্রজন্ম। আমরা খুব শীঘ্রই মানবিক প্রজন্ম হারাতে বসেছি। কবি টিপু সুলতান তাই বার বার পেছনে ফিরে যেতে চাই। তার স্মৃতিকাতরতার মধ্য দিয়ে মানবিক বাংলাদেশ, মানবিক প্রজন্ম পাওয়ার আকুতি অ পাঠকের মুগ্ধ করবে। সমাজ প্রেমিক কবি- হারানো গৌরব ফিরে পাওয়ার জন্য বার বার আকুতি জানায়েছেন। এই আকুতি ভাল – সমাজ পাওয়ার আকুতি। কিন্তু এটা সমাধান নয়, সমাধান হচ্ছে বর্তমান সময়ে আমাদের মানুষ হয়ে বিবেক কাজে লাগিয়ে মানুষ ধর্ম বাস্তবায়ন করতে হবে। মানুষ ধর্ম বাস্তবায়িত হলে সমাজ সুন্দর হবে। আমরা বসবাসের উপযোগি কাঙ্খিত বিশ্ব পাবো। বর্তমানকে ধারণ করে মানব কল্যাণকর পৃথিবী নির্মাণই আমাদের একমাত্র কাম্য।

আরো পড়ুন: রঙিন টেলিভিশন আবিষ্কারের ইতিহাস

Next Post Previous Post